আর্কাইভ  সোমবার ● ২৯ নভেম্বর ২০২১ ● ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   সোমবার ● ২৯ নভেম্বর ২০২১

তারা কি আটকেপড়া পাকিস্তানি?

রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১, রাত ০৯:১২

হারুন উর রশীদ

অনেক সুশীল বলেন, ‘খেলার সাথে রাজনীতি কেন থাকবে?’ এপর্যন্ত হয়তো ঠিক। কিন্তু এখন নতুন করে বলতে শুনছি, ‘খেলার আবার দেশ কী? যারা ভালো খেলে তাদের সমর্থন করি। যে দেশ সেরা, তার পক্ষে আছি।’ একথা শুনলে মনে হবে লোকটা তো বেশ উদার, একদম খেলা প্রেমী! তবে শেষের  এই ‘উদারপন্থী বাংলাদেশিরাই’ শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে খেলা দেখেছেন। খেলা শেষে পাকিস্তানের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তারা হয়তো পাকিস্তানি নাগরিক। এখানে হয়তো চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনো কারণে অবস্থান করছেন। নিজ দেশের খেলা দেখতে গিয়েছেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারা। তাই নিজ দেশ পাকিস্তানের পক্ষে তো উল্লাস করবেনই।

কিন্তু দেখলাম তারা সংখ্যায় একটু বেশি। তাই আমার কিছুটা সন্দেহ হয়। সেই সন্দেহের জায়গা থেকে মনে করেছি হয়তো আটকেপড়া পাকিস্তানি হবে।  তারা তো এখানে সংখ্যায় বেশ আছেন। কিন্তু খেলা শেষে টেলিভিশন এবং অনলাইনের লাইভে তাদের পরিচয় পেয়ে আমি তো হতবাক। তারা বাংলাদেশি! বাংলাদেশের নাগরিক! তারা বাংলাদেশের পরাজয় আর পাকিস্তানের জয়ে উল্লসিত। লেখার শুরুতেই যে কথাগুলো বলেছি সেই যুক্তিই তারা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘খেলার কোনো দেশ নাই। বাংলাদেশি হলেও পাকিস্তান ভালো খেলে তাই তারা পাকিস্তানের পক্ষে।’ কেউ কেউ বলছেন, ‘বাংলাদেশ পাকিস্তান দুই ভাই। যে হারুক যে জিতুক তাতে কোনো সমস্যা নাই।’ একজনকে পাওয়া গেল যে বলছে- ‘পাকিস্তান আর বাংলাদেশ তো একটাই দেশ। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশটা ভাগ হয়ে গেলো।’

এখানে স্পষ্ট বোঝা গেলো বাংলাদেশকে তারা এখনও পাকিস্তানই মনে করে। বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য তারা মনকষ্টে ভুগছে। আর শেষের বক্তব্যটি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদেও দেখা গেলো। এই দলটি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। তারা তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লিখে রেখেছেন। কেউ আবার বুদ্ধিজীবী ও সামাজ চিন্তক স্টাইলে বলছেন, ‘বিসিবির ব্যর্থতার কারণেই আমরা পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়ে প্রতিবাদ করছি।’

আবার কেউ আরেকটু এগিয়ে বলছেন, যে দল খেলছে সেই দলকে তারা বাংলাদেশের যোগ্য দল মনে করছেন না। তাই পাকিস্তানের পক্ষে তারা। পাকিস্তানের পক্ষে থাকতে তারা তাদের যতরকম কু এবং অসাড় যুক্তি আছে সব তৈরি করছেন। কিন্তু আমার কথা হলো কেউ বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় পাকিস্তানের পক্ষে গেলে যেতেই পারেন। সেটা তার স্বাধীনতা, সেটা তার পাকিস্তান প্রেম। কিন্তু তার জন্য এত কু-যুক্তি দিতে হবে কেন? তারা কি পাকিস্তান প্রেমী হয়েও তা সরাসরি বলতে লজ্জা পাচ্ছেন? আপনারা পাকিস্তান প্রেমী, সেটা তো আর বুঝতে বাকি নেই। গর্তে লুকিয়ে থাকলেও সময় মতো প্রেম প্রকাশ করেন।

এত লজ্জার কিছু নাই। প্রেম ভালোবাসায় লজ্জা থাকতে নেই। বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের প্রতি প্রেম তাদের না ই জাগতে পারে। মন পড়ে থাকতে পারে পাকিস্তানে । দেহটা হয়তো পড়ে আছে এখানে। আর এটা যে শুধু এখন তা নয়, অতীতেও ছিল।

১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তো পাকিস্তান প্রেমী ছিল। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তো পাকিস্তান প্রেমীরা প্রকাশ্যেই যা করার করেছেন। তারা ইসলামের  নামে, দেশ প্রেমের নামে হত্যা, ধর্ষণ, লুট সবই করেছেন। তবে তাদের এই পকিস্তান প্রেম তাদের সাধের পকিস্তানকে ধরে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।  কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো ওই পাকিস্তান প্রেমীরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানেই থেকে গেছেন। তাদের সাধের পকিস্তান তাদের নেয়নি। কিন্তু বাংলার পাকিস্তান প্রেমীদের প্রেম তাতে একটুও কমেনি। হয়তো বা দূরে থাকায় হৃদয়ের টান আরো বেড়েছে।

এই খাঁটি পাকিস্তান প্রেমিরা এখন ছানাপোনা জন্ম দিয়ে সংখ্যায় বেড়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পাকিস্তান প্রেমীরা তো রাষ্ট্র ক্ষমতাই দখল করে বসে। তারপর তারা তাদের  প্রেম ও প্রেমের ফসল উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানি খান সেনারাও কিছু বীজ রেখে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এখানে পকিস্তান প্রেমীদের সংখ্যা জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে। সেই তারাই এখনো সময় সুযোগ পেলে একযোগে শিয়ালের মতো হুক্কাহুয়া ধ্বনি দেয়।

শনিবারও এই শিয়ালরা স্টেডিয়ামের সামনে খেলার আগে পাকিস্তানের পতাকা আর ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার অবশ্য পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। বাংলাদেশি এক তরুণী বেশ কয়েকবছর আগে ঢাকার মাঠে স্বাধীনতা কাপ ক্রিকেট ম্যাচের সময় ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ প্লাকার্ড নিয়েও হাজির হয়েছিলেন। তাদের এই মন, প্রাণ আর শরীরের প্রেম দেখে আমার মনে হচ্ছে তারা আসলেই আটকেপড়া পাকিস্তানি। তাদের এখানে থাকতে বড় কষ্ট হচ্ছে। আমাদের উচিত চাঁদা তুলে হলেও তাদের নিজ দেশ পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো।

খেলার সাথে অবশ্যই রাজনীতি আছে। আছে দেশপ্রেম। কোনো দেশের নাগরিক খেলায় তারা তার দেশের পরাজয়ে ব্যথিত হবেন, হতাশ হবেন। এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে দেশকে বাদ দিয়ে আরেক দেশের প্রতি ভালোবাসা আর সমর্থন জানাবেন এটা আসলে হয় না। সেটা বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান, বাংলাদেশ বনাম ভারত অথবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গেই হোক না কেন। ভালো খেলার প্রশংসা করতে হবে। তাই বলে দেশের বিরুদ্ধে যেতে হবে! কারুর বাবা যদি সন্তানকে লালন পালনে অক্ষম হন সেই সন্তান কি তার বাবা পাল্টে ফেলবেন! তাহলে ওই সন্তানের জন্ম পরিচয় নিয়ে তো প্রশ্ন তোলাই যায়।

আর যদি হয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান তাহলে তো কথাই নেই। তাদের বার বার হারিয়ে ডাবল জয়ের আনন্দ তো এই জাতি নিতেই চাইবে।  কিন্তু  বাংলাদেশের পরাজয়ে যিনি ডাবল আনন্দ পাবেন তার তো শেকড় আর মূল নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা বলেছেন, ‘খেলার সাথে কোনো কিছু মেলানো যায় না এটা ঠিক, কিন্তু খেলাটা যখন আমাদের দেশে আর খেলছে আমাদের দেশ, সেখানে অন্য যে দেশই খেলুক না কেন, তাদের পতাকা তাদের দেশের মানুষ ছাড়া আমাদের দেশের মানুষ উড়াবে এটা দেখে সত্যিই কষ্ট লাগে। ভাই যে যাই বলুক দেশটা কিন্তু আপনার। আজ হয়নি তো কাল হবে, না হলে পরশু হবে। আপনারা পাশে না থকলে আর হবেই না। হারি জিতি স্টেডিয়ামে আমাদের দেশের পতাকা উড়ুক, চিৎকার হোক বাংলাদেশ।’

মাশরাফির এই কষ্ট আমাকে কষ্ট দেয় না। কারণ আমি জানি ওরা চিন্তায়, ধ্যানে পাকিস্তানি। ওরা পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া বীজ। আমাদের কাজ হচ্ছে ওদের নিজ দেশ পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো।

লেখক: সাংবাদিক

(সময় টিভিতে প্রকাশিত)

মন্তব্য করুন


Link copied