আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ২৬ মে ২০২২ ● ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
আর্কাইভ   বৃহস্পতিবার ● ২৬ মে ২০২২

https://www.facebook.com/Safeandsaverestaurant

কিছু গণমাধ্যম যেন ছেবারতের জাল

মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, দুপুর ১১:২২

আব্দুর রউফ সরকার
আমাদের গ্রামে ছেবারত আলী নামে এ লোক ছিলেন। তাঁর সরিষার তেলের ঘানি ছিল। এ এলাকায় তেলের ঘানিকে বলা হয় তেলের গাছ। তিনি ছেবারত তেলী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গরীব। অনেক কষ্টে দিন কাটত। কষ্টের সংসার চালাতে গিয়ে তাঁকে অনেক কৌশল করতে হতো। তিনি ঘানি টানার পাশাপাশি মাছ ধরার জাল বুনে বিক্রি করতেন। সেটা ছিল তাঁর সংসারের জন্য একটু বাড়তি আয়ের পথ। কিন্তু, ঘানি টানা আর জাল বোনা তো একসাথে করা যায় না। তাই তিনি অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। 

তাঁর বাড়ির আঙিনায় বড় বড় গাছের নীচে ছিল বাশেঁর টং(মাচা)। তিনি জালের কিছু অংশ বুনন করে সুতা এবং জাল বুননের মাকুসহ টংএর পাশে বাঁশের খুটিতে ঝুলিয়ে রেখে নিজের কাজে যেতেন। গ্রামের লোকজন, বিশেষ করে যাদের তেমন কাজ নেই তারা পালাক্রমে গাছের ছায়ায় ওই টংএ বসে দিনভর আড্ডা দিত, পান-তামাক খেতো। আর আড্ডার ফাঁকে যখন যার মনে হতো ছেবারতের জাল বুনতো। নানা জনের নানা দক্ষতায় জালের ফাঁস কোনটা বড় হতো, কোনটা ছোট হতো। নুতন কারিগরদের কেউ আবার ভুল করে সুতায় গিট্টু লাগিয়ে কেটে পড়তো। দক্ষ কারিগরদের মধ্যে কেউ আবার সেই গিট্টু খুলে জাল বুননের কাজ এগিয়ে নিতো। কেউ জাল বুনতে পারুক না পাারুক ছেবারতের জাল বুনতে হাত লাগাতো। এভাবে ছেবারতের স্পর্শ ছাড়াই গ্রামবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে শেষ পর্যন্ত জালটি পূণাঙ্গ রূপ পেতো। এতে জালের মান যাই হোক বিনাশ্রমে নির্মিত জালটি বিক্রি করে ছেবারত দুটো পয়সা পেতো। আমাদের এলাকায় এ জাল “ছেবারতের জাল” নামে খ্যাতি অর্জন করে। বর্তমানে অদক্ষ লোকের যৌথ প্রচেষ্টার যে কোন জগাখিচুড়ি কাজকে ছেবারতের জাল বলে আখ্যা দেয়া হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমকে আমার কাছে ছেবারতের জাল বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের ঘরে এখন অসংখ্য ছেবারত পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল, অনলাইন টিভি এবং টিভি চ্যানেল খুলে বসেছেন। তারা কোন সাংবাদিককে বেতন দেন না। বরং কার্ড দিয়ে টাকা নেন। আবার, সময়ে সময়ে কার্ড নবায়নের নামে সাংবাদিকদের কাছে টাকা নেন। এমনকি কিছু নিউজ প্রচার/প্রকাশের জন্য টাকা নেন। তাই, কোন প্রকার যাচাই-বাছাই, স্বভাব চরিত্র বা যোগত্যার বিচার না করেই তারা যাকে তাকে সাংবাদিকতার মতো স্পর্শকাতর, সৃজনশীল, জটিল এবং দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগ করছেন। দুটো লাইন শুদ্ধভাবে লিখতে পারে না সে হয়েছে ব্যুরোচিফ, স্টাফ রিপোর্টার।

ছাপাখানার পেস্টার হয়েছে বার্তা সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক। পত্রিকা অফিসের বিট পিয়ন হয়েছে চিফ রিপোর্টার। আমার দেখা প্রেসক্লাবের পিয়ন, মাদক ব্যবসায়ী, পান দোকাদার, রাস্তার ফেরিওয়ালা, বাসের কন্ডাক্টর, চুরি-ছিনছাইকারীদের দু/চারজনকে পত্রিকার জেলা প্রতিনিধির কার্ড ঝুলিয়ে, মোটর সাইকেলে প্রেসের স্টিকার লাগিয়ে রাস্তা দাপিয়ে অফিস-আদালত কাঁপিয়ে বেড়াতে দেখি। কোন মিডিয়া হাউস এদেরকে বেতন দেয় না। অথচ সংবাদ লিখুক বা না লিখুক, সাংবাদিকতা জানুক বা না জানুক বেতনভূক্ত সাংবাদিকদের চেয়েও এরা সক্রিয়, সরব, সর্বত্র বিরাজমান। এরা দুটো পয়সার লোভে প্রতিনিয়ত অপসাংবাদিকতার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে কলুষিত করছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানী করছে, মিথ্যা তথ্য প্রচার করে অহতেুক মানুষের সম্মান হানি করছে এবং দাপ্তরিক কাজের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সাংবাদিকতার অপব্যবহারের সুবিধা পেয়ে একটা নেশার মধ্যে পড়ে এরা প্রতিনিয়ত সমাজের এবং নিজের ক্ষতি করে চলেছে। ভালো সাংবাদিকরা এদের কারণে যথাযোগ্য মর্যাদা পাচ্ছেন না। এতে সাংবাদিকতা সম্পর্কে জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। 

এ এক আজব দেশ। প্রতিটি পেশায় নিয়োগের জন্য একটি যোগ্যতার মাপকাঠি থাকে। কিন্তু, সাংবাদিকের কোন যোগ্যতার মাপকাঠি নেই। উকিল হতে গেলে এলএলবি পাশ করে বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় পাশ করতে হয়, ডাক্তারী করতে গেলে ডাক্তারী বিদ্যা অর্জনের পরও রেজিস্ট্রেশন অর্জন করতে হয়, লেখাপড়া  শেষ করে শিক্ষক হতে গেলেও এখন নিবন্ধন পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। যে কোন চাকুরীতে কমপক্ষে একটি যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয়। অথচ, এদের মতো সাংবাদিক হতে কিছুই লাগে না। আমরা সাংবাদিকদের সামনে বক্তৃতা দেয়ার সময় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কথা বলি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কথা বলি। এদেরকে দিয়ে সেটা আশা করা কি উচিৎ? মনে রাখতে হবে “ছাগল দিয়ে জমি চাষ করা যায় না”।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে গণমাধ্যমে এভাবে অপসাংবাদিকদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে কেন, কার স্বার্থে? কে এদের রুখবে? তথ্য মন্ত্রণালয় কি এর দায় এড়াতে পারে ? ছেবারতের জাল অকর্মা লোকেরা আর কতদিন বুনবে?

লেখক: অধ্যক্ষ, উত্তরবাংলা কলেজ

মন্তব্য করুন


Link copied