আর্কাইভ  রবিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ● ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   রবিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২১

মানুষের পরিচয় হোক মানুষ

মঙ্গলবার, ২ নভেম্বর ২০২১, সকাল ০৭:৫১

বিনয় দত্ত

হিন্দুদের পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা শুরু হয় অষ্টমীর দিন থেকে। ১৩ অক্টোবর থেকে লাগাতার, কখনো থেমে থেমে হামলা হয়েছে। বিস্ময়কর হলো, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ইন্টেলিজেন্স, প্রশাসন হিন্দুদের ওপর হামলা থামাতে পারছে না।

গণমাধ্যম আগে থেকেই বিটিভির কমলা লেবুর বাম্পার ফলনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। এই নীরবতা মনে রাখবে সবাই। ইতিহাস এই সময়ের সাক্ষ্য দেবে আলাদাভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জায়গায় হামলার খবর এসেছে।

পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলায় ১৬ জেলায় প্রায় ২৪ হাজার আসামি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ২৪টি মামলা নোয়াখালীতে, আসামি ৭ হাজার ৯৬১ জন। সর্বোচ্চ গ্রেপ্তার চট্টগ্রামে, ২০১ জন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৩ জন কাউন্সিলরও আসামি। প্রশ্ন হলো, এই ২৪ হাজার আসামি কারা? তাদের কী কেউ চেনে? নাকি অপু, ১০, ২০, ৩০, ৪০ করে ২৪ হাজার আসামি করা হয়েছে?

আরও প্রশ্ন হলো, ২৪ হাজারের মধ্যে শুধু ইকবাল হোসেনের নাম আসছে। বাকিরা কোথায়? ধরলাম, ২৪ হাজার আসামি অভিযুক্ত এবং অপরাধী। যদি প্রশাসন আন্তরিক থাকতো তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ঘটনার ইতি ঘটাতে পারতো। ইকবাল হোসেন তার অপরাধ স্বীকার করেছেন। মজার বিষয় হলো, ইকবাল পাগল বলে জানিয়েছেন তার পরিবার। এখন এই মামলার কী গতি হবে তা সহজেই অনুমেয়। অনেকেই ইকবাল হোসেনকে জজ মিয়া গল্প বা নাটক বলে সংজ্ঞায়িত করছেন। তার কারণ অনেক। গত ১৩ অক্টোবর ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ইকবালকে বের করতে সময় লেগেছে সপ্তাহখানেক। একটা ভয়ংকর ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বের করে আসামি বের করতে যদি ৭ দিন লাগে, সেই ঘটনার গতি কী হবে তা ধারণা করা যায়।

এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে সর্ববৃহৎ সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছিল। যা নোয়াখালী গণহত্যা বা নোয়াখালী হত্যাযজ্ঞ নামেও পরিচিত। সেই হামলা থামানোর জন্য মহাত্মা গান্ধীকে নোয়াখালী আসতে হয়েছিল। ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, সেইসময়ও তৎকালীন নেতারা সাম্প্রদায়িক হামলাকে সাধারণ ঘটনা বা ছোটখাটো ঘটনা বলে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধী আসল ঘটনা জানতেন। তাই তিনি সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রেক্ষাপট ছিল দেশ স্বাধীনের আগে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত যতগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তার কি বিচার হয়েছে? চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, হয়নি। কেন হয়নি? তার কারণ বহু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই সাম্প্রদায়িক হামলার বিচারে আগ্রহী নয়। কারণ সাম্প্রদায়িক হামলা কারা করে? দেশের গরিষ্ঠ ধর্মের মানুষ। যখনই সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার করতে যাবে তখনই গরিষ্ঠ ধর্মের অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। তাই কোনো সরকারই সেই পথে হাটেনি।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি অবশ্য নতুন নয়। প্রত্যেক সরকার তার অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ধর্মকে রাজনীতির অংশ করেছে। ধর্মকে ব্যবহার করেছে। দৃশ্যত ধর্মকে সরাসরি ব্যবহার করে এই উপমহাদেশে রাজনীতি জমানো হলেও অপরদিকে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা যে বাড়ছে, তা তাদের চিন্তা বা ভাবনায় নেই।

অ্যা ওয়ার্ল্ড অব অ্যাথিজম: গ্লোবাল ডেমোগ্রাফিক্স (A World of Atheism: Global Demographics) নাস্তিকদের কাছে জনপ্রিয় একটি বই। এটিকে বই, হ্যান্ডবুক বা গবেষণাপত্রও বলা যায়। এটি লিখেছেন আরিয়ালা কেজার (Ariela Keysar) এবং জুহেম নাভারো-রিভেরা (Juhem Navarro-Rivera)। বইটি নাস্তিক্যবাদ নিয়ে লেখা হলেও পৃথিবীর ৪ হাজার ৩০০ ধর্মের মানুষই তা পাঠ করতে পারবেন, তাতে আপত্তি নেই। এই ২ সমাজবিজ্ঞানী অসংখ্য বৈশ্বিক গবেষণার পর্যালোচনা করেন। তাদের মতে, বিশ্বব্যাপী ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ইতিবাচক নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদী রয়েছেন (যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ), তার মধ্যে চীনে সবচেয়ে বেশি নাস্তিক রয়েছেন। যার সংখ্যা ২০০ মিলিয়ন। এরা বিশ্বাসী নাস্তিক।

বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে নাস্তিক্যবাদ বা নাস্তিক হলেন অপরাধী। কিন্তু ধর্মহীনতা আসলে কী? এর মধ্যে থাকতে পারে ধর্মবাদ, অজ্ঞেয়বাদ, অজ্ঞতাবাদ, ধর্মবিরোধী, নাস্তিকতা, সংশয়বাদ, আধ্যাত্মিক কিন্তু ধর্মীয় নয়, মুক্তচিন্তা, অপার্থিববাদ, অবিশ্বাস, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ, অধর্মীয় ধর্মবাদ, প্যানথাইজম ইত্যাদি।

যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী নয়, ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে, সেই জায়গায় বাংলাদেশে ধর্ম হলো রাজনীতির অংশ। ধর্ম অবশ্যই চর্চার বিষয়। ধর্ম থেকে পরমতসহিষ্ণুতা, মানবিকতা, স্থিরতা, বিশ্বাস, জ্ঞান, শেখার জায়গা আছে। কিন্তু সেই ধর্মকে যেভাবে ব্যবহার করা হয় তাতে ধর্মই রাজনীতির বলী হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

যেমন বলী হয়েছেন যতন সাহা, দিলীপ দাশসহ অনেকেই। প্রশ্ন হলো, এই পরিবারের ক্ষত ঘুচবে কীভাবে? দিলীপ দাশের মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছেন, 'আমার বাবার অপরাধ কী?' কেউ কি জানেন দিলীপ দাশের অপরাধ কী? কিংবা ধরুন যতন সাহার ৪ বছরের ছেলের অপরাধ কী? এই শিশু কেন তার বাবাকে হারালো? কেন যতন সাহার স্ত্রী লাকি রানী সাহাকে বৈধব্য গ্রহণ করতে হলো? কারো কাছে কি উত্তর আছে? কেউ কি জানেন তাদের খুনের আসামি কে বা কারা? তাদের খুনের জন্য কাকে শাস্তি দেওয়া হবে?

যতন সাহার ছেলে বা দিলীপ দাশের মেয়ের কাছে তাদের পিতাই ছিলেন ঈশ্বর, পিতাই ধর্ম। এই বিশ্বাস যারা নষ্ট করেছেন তাদের কী হবে? ২ পিতাকে যারা খুন করেছেন তাদের কী হবে? কিছুই না।

রংপুরের পীরগঞ্জের জেলেপল্লীতে আগুন দেওয়ার মধ্যে কি শান্তি নিহিত? এই অশান্তি এসেছে ফেসবুকের মাধ্যমে! ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলা, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর সারাদেশের ২২টিরও বেশি জেলায় চালানো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলা, ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হামলা, ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভোলার বোরহানউদ্দিনে 'তৌহিদী জনতা'র সাম্প্রদায়িক হামলা, ২০২০ সালে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, কুমিল্লার মুরাদনগর বা ভোলার মনপুরায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, ২০২১ সালে মার্চে সুনামগঞ্জের শাল্লার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও নির্যাতন, ২০২১ সালের অক্টোবরে শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালীন পূজা মণ্ডপ ও হিন্দু বাড়ি-ঘরে হামলা—সবই সংঘটিত হয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

ফেসবুকে আইডি হ্যাক করে কিংবা হিন্দু বা বৌদ্ধ নামে একটি ফেক আইডি তৈরি করে ইসলাম ধর্মের নামে জঘন্য কথা লেখা হয়। এরপর সেই লেখাকে কেন্দ্র করে মন্দিরে হামলা, হিন্দু বা বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলা, দোকানপাটে হামলা বা আগুন দেওয়া হয়। এরপর লুটপাট, ধর্ষণসহ অনেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য ফেসবুক আইডি হ্যাক করা, ইসলাম ধর্মের নামে জঘন্য কথা বলা থেকে শুরু করে লুটপাট, ধর্ষণ সবই করে গরিষ্ঠ ধর্মের লোকজন। আর আসামি হয় কারা? আসামি হয় রসরাজ, ঝুমন দাস, উত্তম বড়ুয়া, টিটো রায় বা পরিতোষ।

২০১২ সাল থেকে এই স্ক্রিপ্ট চলছে। প্রশাসনের ভূমিকা যথারীতি তথৈবচ। প্রশ্ন হলো, ২০১২ সালের আগে কি সাম্প্রদায়িক হামলা হতো না? অবশ্যই হতো। তখন মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বা মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষ জড়ো করে সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটানো হতো। এখন ফেসবুকের মাধ্যমে করা হয়। প্রশ্ন হলো, দেশের মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীকে ফেসবুকে কটূক্তি করলে যদি মুহূর্তেই অপরাধী ধরা পড়ে তাহলে এতো বড় সাম্প্রদায়িক হামলা, হত্যাকাণ্ডের পরও অপরাধী ধরা পড়ে না কেন? কেন তাদের শাস্তি হয় না? এর উত্তর আপনাদের জানা।

যে হারায় সে জানে হারানোর বেদনা কতখানি। গত ৫০ বছরে এই দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা অনেক কিছুই হারিয়েছেন। তাদের নিঃশ্বাসে বাতাস ভারী। কান পাতলে তাদের কষ্ট শোনা যায়, আর্তনাদ খামছে ধরে। তারা আজ পর্যন্ত বিচার পায়নি, পাবে সেই আশাও নেই। ৫০ বছরেও হয়নি। এইভাবে কী একটি দেশ চলতে পারে?

এই দেশে ৫ দিনের দুর্গাপূজা, বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, তাজিয়া মিছিল কিছুই নিরাপদ নয়। নিরাপদ শুধু সাম্প্রদায়িকতা আর ভয়। ভয়ের রাজনীতি কি একসময় ছায়া মাড়াবে না? আমি মনুষ্যত্বে বিশ্বাসী। মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব ফিরে আসুক সেই প্রত্যাশা আমি সবসময়ই করি। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখবো কি না জানি না, তবে এই প্রত্যাশা আমার সবসময়ই থাকবে। আমি চাই ধর্ম নয়, মানুষের পরিচয় হোক সে মানুষ। জ্ঞানত মানুষ।

বিনয় দত্ত, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য করুন


Link copied