আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ৪ অক্টোবর ২০২২ ● ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ৪ অক্টোবর ২০২২
 
 
শিরোনাম: রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত       পঞ্চগড়ে নৌডুবিতে ইজারাদার ও অদক্ষ মাঝিকে দায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল       অপুকে ডিভোর্সের ১৪৮ দিন পর বুবলীকে বিয়ে করেন শাকিব       সয়াবিন তেলের দাম লিটারে কমল ১৪ টাকা       বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ এক ডিগ্রী বেশি- রংপুরে জিএম কাদের      

অদম্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

শনিবার, ২৬ মার্চ ২০২২, সকাল ০৮:৪২

ডেস্ক: ১৯৭১ থেকে ২০২২। ৩০ লাখ শহিদের রক্ত দিয়ে আঁকা আবেগ ও ভালোবাসায় পূর্ণ, লাল-সবুজের মানচিত্রের একান্ন বছর। শোষণ-বঞ্চনার শিকল ছিঁড়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর বাংলাদেশ।

এটি শুধু একটি দেশের স্বাধীনতাই নয়, শোষকদের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণাও বটে। শুধু তাই নয়, কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতি শুধু মনোবলের জোরে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীকে হার মানাতে পারে-তা সারাবিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। কিন্তু ৫১ বছরে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে দেশ অনেক এগোলেও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি রাজনীতিতে। দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি প্রতিরোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন। অর্থ পাচার রোধ, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।  

অর্থনীতির আকারে বর্তমান বিশ্বে ৪০তম বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বব্যাংক থেকে স্বীকৃতি মিলেছে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার। এসব অর্জন বাংলাদেশের সক্ষমতার পাশাপাশি মর্যাদাও বাড়িয়েছে।

বর্তমানে ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম, তৈরি পোশাকে দ্বিতীয়, পাট রপ্তানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠালে দ্বিতীয়, চাল, মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, আম ও আলুতে সপ্তম, ক্রিকেটে, আউটসোর্সিং ও বাইসাইকেল রপ্তানিতে অষ্টম, পেয়ারায় অষ্টম এবং মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম অবস্থানে বাংলাদেশ।

এ অর্জন শহিদদের জানান দেয়, তোমাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ৫১ বছর আগে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের নাম বাংলাদেশ।তবে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি বেশি। এর অন্যতম হলো দারিদ্র্য বিমোচন।

কারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। তবে এ দুই খাতে সামগ্রিক গুণগত মান আরও উন্নতি করা জরুরি। 

এছাড়া মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নারীর ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় বড় ভৌত অবকাঠামো অর্জনের পাল্লাকে অনেক ভারী করেছে। আরও আছে নিজস্ব স্যাটেলাইট, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন চলমান মেগা প্রকল্প।

আর সবকিছুকে ছাপিয়ে ক্রিকেটের অবিশ্বাস্য উন্নতি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নতুনরূপে পরিচিতি দিয়েছে। এসেছে বিশ্ব শান্তিতে নোবেলও। এখন ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই দেশটি এখন বিশ্বে উন্নয়নের ‘রোড মডেল’। 

তবে সামনের দিনগুলোতে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। সম্পদ, আয় এবং ভোগের ক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য রয়েছে। মোট সম্পদের প্রায় ৫২ শতাংশই উচ্চ শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের হাতে। আর নিম্ন শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র দশমিক ০৪ শতাংশ।

দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থ পাচার বন্ধ করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করাই হবে মূল কাজ। এগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব কমানো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিতভাবে পরিমাণগত সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। এর সুফল সবার কাছে পৌঁছানো জরুরি। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ৫১ বছরে দেশের অর্থনীতিতে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।

স্বাধীনতার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে কিছু থাকবে না। সেখান থেকে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

এর মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, প্রাথমিক শিক্ষা এবং নারীশিক্ষাসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বিশাল অর্জন হয়েছে। এছাড়া ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণে সুপারিশ মিলেছে।

সেখানে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বেশ ভালো অবস্থান। তবে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। কারণ অর্জনের পাশাপাশি অর্থনীতিতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রপ্তানি।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের রপ্তানি খাত গার্মেন্টনির্ভর। কোনো কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যটি মার খেলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় আসবে। এ খাতে রপ্তানিতে পণ্যের বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

কারণ কয়েক বছর ধরে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ছে না। করোনায় তা আরও কমে গেছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং ইজ বিজনেস (সহজে ব্যবসা করা) রিপোর্টসহ বেশকিছু সূচকে ভালো করতে হবে।

১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। যা ১ বিলিয়নের কম। বর্তমানে তা ৪০০ বিলিয়ন ডলারে ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে অর্থনীতির আকার ৭০০ গুণ বেড়েছে।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ওই সময়ে জাতীয় বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

এর মধ্যে রাজস্ব আয় মাত্র ২৫০ কোটি টাকা থেকে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ৫০১ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আজ পৌঁছেছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার।

বর্তমানে তা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। বর্তমানে তা ২৫৯১ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

আমদানি মাত্র ২৮ কোটি ডলার থেকে এ বছর শেষে ৮৮ বিলিয়ন, রপ্তানি ৩৩ কোটি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) আসত ৮০ লাখ ডলার।

৫ দশকে তা ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে। অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক সূচকেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৪৭ থেকে প্রায় ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে।

১৯৭২ সালে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ৮৮ শতাংশ, সেখানে আজ এ হার কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৪৭ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে নেমেছে। জাতিগঠনের অন্যতম উপাদান শিক্ষা।

৫০ বছরে সেখানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭২ সালে শিক্ষার হার ছিল ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৭২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ১৬০ থেকে কমে ৩ দশমিক ৮ এবং মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৬ থেকে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৭২ সালে ১০ হাজার ৪৯০ জন মানুষের জন্য একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছিল। বর্তমানে দুই হাজার ৫৮০ জনের জন্য একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। ওই সময় ৪০ শতাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। কিন্তু কিছুটা খাদ্য আমদানি করা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার খাদ্য রপ্তানিও করা হচ্ছে।

ওই সময়ে দেশে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৮ লাখ টন। বর্তমানে তা বেড়ে ৪ কোটি ৫৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া শিল্প খাতের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ৫১ বছরে কৃষিকে ছাড়িয়ে গেছে শিল্প।

হালকা প্রকৌশল, সফটওয়্যার ও ওষুধ শিল্প অনেক এগিয়েছে। বর্তমানে গার্মেন্ট শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। চীনের পরই আমাদের অবস্থান। এ গার্মেন্টই বিশ্বে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’কে পরিচিতি দিয়েছে।

পরিমাণগত সূচকে অনেক অর্জন হলেও সীমাহীন বৈষম্য রয়েছে। গিনি কো-ইফিসিয়েন্ট (কোনো দেশের আয় ও সম্পদের অসমতা বোঝাতে ব্যবহৃত সূচক) অনুসারে উচ্চ আয়ের ৫ শতাংশ মানুষের কাছে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ শতাংশ।

আর নিম্ন শ্রেণির ৫ শতাংশের কাছে দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এছাড়া মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশই উচ্চ শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের দখলে। আর নিম্ন শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের মোট দশমিক ২৩ শতাংশ। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।

সরকারই বিষয়টি স্বীকার করছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুসারে দুর্নীতিতে বর্তমানে বাংলাদেশর অবস্থান ১২তম। বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে এই দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

এছাড়া অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংগঠন গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্য অনুসারে প্রতিবছর দেশ থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এটি রোধ করা জরুরি। অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাত অত্যন্ত দুর্বল।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজার দুই খাতের অবস্থাই খারাপ। দুই খাতে ব্যাপক সংস্কার জরুরি। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ব্যাপকবিদ্ধ। স্বাধীনতার ৫১ বছরেও ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতিতে চূড়ান্ত করা যায়নি। খবর-যুগান্তর

মন্তব্য করুন


Link copied