আর্কাইভ  রবিবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ● ১০ আশ্বিন ১৪২৯
আর্কাইভ   রবিবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
 
 
ব্রেকিং নিউজ
শিরোনাম: পঞ্চগড়ে নৌকা ডুবে ১৫ জনের মৃত্যু       উত্তরবঙ্গে তাপমাত্রা কমার আভাস       অস্কারে যাচ্ছে ‘হাওয়া’       রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যায় ইছাহাকের খালাসের আদেশ স্থগিত       রংপুরে ভুয়া চাকুরীদাতা প্রতারক চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার      

কী এই হাইড্রোজেন পার অক্সাইড

সোমবার, ৬ জুন ২০২২, সকাল ০৯:৫৪

ডেস্ক: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত মিসাইলের মতোই ছড়িয়ে পড়ল সীতাকুন্ডের কনটেইনার ডিপোর আগুন! এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং এর অনিবার্যতার বিষয় তুলে ধরলেন রসায়নবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কীভাবে এ আগুন লাগল তা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা তদন্ত কাজ শুরু করেছে। তবে কীভাবে ছড়াল এই বিধ্বংসী আগুন, কীভাবে ‘আগুনমুখী পতঙ্গে’র মতো পুড়ে হতাহত হলেন এত মানুষ, তা নিয়ে বের হয়ে এসেছে অনেক তথ্য।

বাংলাদেশে যারা রাস্তাঘাটে কান পরিষ্কার করে থাকেন তারাও এই পদার্থটি ব্যবহার করে থাকেন বলে জানা যায়। গাঢ় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রকেটের জ্বালানিতে প্রোপেল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন কারখানায় ইটিপি বা কারখানা বর্জ্য মিশ্রিত পানি বিশুদ্ধকরণে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিষ্কার বা নিরাপদ করার ক্ষেত্রেও এই যৌগ ব্যবহার করা হয়।

সরেজমিন লক্ষ্য করা গেছে, সীতাকুে র এই বিএম কনটেইনার ডিপো বা এই ড্রাইপোর্টে অন্তত ৫০০ মিটারের একটি টিনশেডের ভিতর বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নামের রাসায়নিক দাহ্য ছিল। এ ছাড়া রপ্তানি পণ্য ও আমদানি পণ্য ছিল বিপুল পরিমাণে। ঘটনার ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক যাতে সব দিকে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য সেনাবাহিনীও সক্রিয় হয়।

বিশিষ্ট রসায়নবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী জানালেন, অন্তত ১৬টি কনটেইনারে শুধু হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বা দাহ্য রাসায়নিক থাকার প্রাথমিক তথ্য জেনেছি। যেহেতু এই রাসায়নিক আগুন, আলো এবং পানিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে দ্রুত, সেহেতু কনটেইনারের বিস্ফোরণের ভয়াবহতা ব্যাপক হয়েছে।

এদিকে এই রসায়নবিদের এমন বক্তব্যের সহমত পাওয়া যায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কর্মকর্তার বক্তব্যেও। সেনাবাহিনীর শতাধিক সদস্য সকাল ১০টা থেকেই কাজ শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলেই সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহনাজ সুলতানা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আশপাশে কোনো নালা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাসায়নিকটি যাতে সমুদ্রে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।’

রসায়নবিদ ড. ইদ্রিস আলী জানান, রাসায়নিকটির নির্দিষ্ট তাপমাত্রা হেরফের হলে, কিংবা অন্য কোনো কেমিক্যালের সংস্পর্শ পেলে অববা সূর্যের আলো ও পানি বা কনটেইনার মুখ খোলা থেকে বাতাস বা তাপ লাগলেই এটি ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণ হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের পানির গতি থেকেও এই বিস্ফোরণ সম্প্রসারিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকতে পারে।’

রসায়নবিদ ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী আরও জানান, জার্মানে নাৎসিরা প্রতিপক্ষকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এই হাইড্রোজেন পার অক্সাইড পুশ করেই মারতেন। এই রাসায়নিকটির গলনাঙ্ক মাইনাস দশমিক চার তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা বাষ্প হতে থাকে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আলো পেলে বা পানি পেলে এটির অনু ভাঙতে থাকে আর এক একটি বিপর্যয় ঘটে। সাধারণত এর আট শতাংশ ঘনত্বেই মানুষসহ জীবজন্তুর চামড়াসহ জীবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিবেশ ও প্রতিবেশে এই বিস্ফোরণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কেও দায়িত্ব¡শীলদের সচেতন থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই রসায়নবিদ।

‘এই হতাহতের ঘটনা থেকে বাঁচতে দায়িত্বশীলদের এই রাসায়নিক সংরক্ষণ, লোডিং, স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি ছিল।’ জানিয়ে ড. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত রাশিয়ার মিসাইলের মতো করে একেকটি কনটেইনার বিস্ফোরণ ঘটে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তৃতি ছড়ায়।  ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কনটেইনার ইয়ার্ডটি থাকার কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ‘এই ঘটনা ডিপো মালিক বা দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টদের ‘অসতর্কতা, নির্বুদ্ধিতা ও আনাড়ি উদ্যোগে’র ফসল- মন্তব্য এই রসায়নবিদের।

এদিকে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি এবং চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (সিসিসিআই) মাহবুবুল আলম ক্ষতিগ্রস্ত ডিপোটি পরিদর্শন শেষে এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমদানিকৃত অন্য কেমিক্যালও এই ইয়ার্ডে থাকতে পারে বলে পরিবেশবিদ ড. ইদ্রিস আলীর মতোই জানালেন চেম্বার সভাপতি।

মাহবুবুল আলম বলেন, আগুন কীভাবে লাগল, কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি হলো, তা তদস্তসহ সার্বিক সহযোগিতায় চেম্বার সচেষ্ট রয়েছে।

বিএম ডিপোর মতো অফ ডকগুলোকে ‘পার্ট অব দ্য পোর্ট’ বলে মন্তব্য করে চেম্বার সভাপতি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,  এর অভ্যন্তরে কেমিক্যাল কোন পরিস্থিতিতে ছিল, ঠিকমতো নীতিমালা মানার ক্ষেত্রে অথরিটি মনিটরিং করেছে কি না, তা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বের হয়ে আসবে।’

এদিকে বিএম কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালক মুজিবুর রহমান সিআইপি জানান, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছাড়া অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ ইয়ার্ডটিতে ছিল না। কেন এই আগুন লাগল এবং ছড়িয়ে পড়ল তা তদন্তে নিজেদের পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানিয়ে বলেন, ‘নিহতদের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা, অঙ্গহানি হওয়াদের ৬ লাখ টাকা, আহতদের ৪ লাখ টাকা প্রদান ও নিহতদের পরিবারের কর্মক্ষম মানুষকে চাকরি প্রদানসহ সামগ্রিক দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। ঘটনাটি আমাদের ইচ্ছাকৃত নয়। এটির নেপথ্যে নাশকতা ছিল, নাকি প্রতিপক্ষ কেউ ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা তদন্তেই বের হয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি। খবর- বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন


Link copied