আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ২৬ মে ২০২২ ● ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
আর্কাইভ   বৃহস্পতিবার ● ২৬ মে ২০২২

https://www.facebook.com/Safeandsaverestaurant

আমরা অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছি কি?

মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০২২, সকাল ০৮:৫৮

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

গত কয়েক দিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া তিনটি খুনের ঘটনা দেশের জনগণের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ খুনের ঘটনাগুলো মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গত ২৪ মার্চ (বৃহস্পতিবার) রাত ১০টার দিকে ঢাকার শাজাহানপুরের আমতলী এলাকার রাস্তায় অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু। তার মাইক্রোবাসের পাশে দাঁড়িয়ে গুলি ছোড়ে হেলমেট পরিহিত এক যুবক।

টিপুকে গুলি করে পালিয়ে যাবার সময় খুনির এলোপাথাড়ি গুলিতে ওই সময় গাড়ির কাছে রিকশায় থাকা বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফনান প্রীতি নিহত হন। এ সময় টিপুর গাড়িচালকও আহত হন। অন্যদিকে রোববার (২৭ মার্চ) সকালে ঢাকার শেওড়াপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বুলবুল হোসেন নামে একজন চিকিৎসক। প্রকাশ্য দিবালোকে এ খুনের ঘটনাগুলো ঘটছে যা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই এ ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করছেন সামাজিক অসহিষ্ণুতা হিসেবে।

শাজাহানপুরের খুনের ঘটনায় ইতোমধ্যে পুলিশ শুটার মো. মাসুম ওরফে আকাশে নামে এক ভাড়াটে খুনিকে গ্রেফতার করেছে। আকাশ স্বীকার করেছে যে তাকে ভাড়া করা হয়েছিল খুন করবার জন্য। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করেছিল একাত্তরের প্রেতাত্মারা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে কারাগারের মধ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা তথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জনসভায় গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ রকম অনেক রাজনৈতিক খুনের কিংবা খুনের চেষ্টার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। কিন্তু আশার বিষয় হচ্ছে গত ১৩ বছরে বর্তমান সরকারের শাসনামলে এ ধরনের খুনের মাত্রা অনেক কমে গেছে।

কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জনগণের মধ্যে অনেক ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো পালিয়ে যাবার সময় খুনির ছোড়া এলোপাতাড়ি গুলিতে পথচারী স্কুলছাত্রী নিহত হবার বিষয়টি। কোনো হত্যাকাণ্ডকে মেনে নেওয়া যায় না। তবে এ ধরনের অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ডকে তো নয়ই। প্রীতির মৃত্যু সবার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন মানুষ কতটা পাষণ্ড হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। আমি নিজে প্রীতির পিতা-মাতার আহাজারি শুনেছি টেলিভিশনে। প্রীতি যখন বাসায় ফিরছিল, তখন সে হয়তো চিন্তাও করতে পারেনি যে এ ধরনের ঘটনায় তার মৃত্যু হতে পারে।

এ ধরনের নৃশংসতাকে সামাজিক অসহিষ্ণুতা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। অনেকের মধ্যেই অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটাবার প্রবণতা যত দিন যাচ্ছে তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জোড়া খুনের রক্তের দাগ মিটতে না মিটতে ২৭ মার্চ একজন ডাক্তারকে ছুরিকাঘাতে রাস্তায় মেরে ফেলা হয়েছে। এ খুনের মোটিভ সম্পর্কে পুলিশের তরফ থেকে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান না করা হলেও বলা হয়েছে যে, এখানে ছিনতাই অথবা অন্য কোনো বিষয় জড়িত থাকতে পারে।

তবে যে কারণেই হত্যা করা হোক না কেন, যেভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সম্প্রতি দেশে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি আমরা। একই সঙ্গে দেশে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির পাঁয়তারা চলছে বিভিন্ন দিক থেকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে যে কোনো অন্যায়ের বিচার পাবার বিষয়ে জনগণের এক ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক ঘটনায় খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনো অজ্ঞাত কারণে বিচারের প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও। তবে যে কারণেই হোক না কেন, প্রকাশ্য দিবালোকে এ ধরনের নিশংস ঘটনা ঘটাবার সাহস যারা দেখায় তাদের আইনের আওতায় এনে যত দ্রুত সম্ভব দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য অন্যরা উৎসাহিত বোধ করবে।

গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে। দেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশে পদ্মা সেতুর মতো বিভিন্ন ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। গত দুই বছর ধরে চলমান কোভিড-১৯ অতিমারির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় যখন বিভিন্ন উন্নত দেশ ব্যর্থ হয়েছে, ঠিক সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে খুব ভালোভাবেই কোভিড-১৯ এর স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেছে। বাংলাদেশ কোভিড-১৯ এর টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে পৃথিবীর বুকে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ অর্জনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্ব।

গত ১৩ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভিন্ন দল-উপদল সৃষ্টি হয়েছে। দলের মধ্যে অন্যান্য দল থেকে আসা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সংখ্যা বেড়েছে। দলের নেতৃত্বে থাকা নেতারা নিজেদের বলয়কে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন দল থেকে আসা নেতাদের দলে টেনেছেন, যারা দলে এসে দলের আদর্শের পরিপন্থী কাজকর্ম করছেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। এ কারণেই দলের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে বিধায় অনেকেই এর সুযোগ নিচ্ছে।

দলীয় কোন্দলের কারণে যদি শাজাহানপুরের খুনের ঘটনা ঘটে থাকে, তবে নিরীহ পথযাত্রী স্কুল শিক্ষার্থীর কী অপরাধ ছিল? কেনইবা তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো? এ বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতি হিসেবে সত্যিই আমরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছি যা অনেকেই মনে প্রাণে বিশ্বাস করছেন। বর্তমান সময়ে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর মুনাফা করার মানসিকতা এবং রমজান। সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ অবস্থায় সরকার একদিকে যেমন বাজারে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে, ঠিক তেমনি প্রায় এক কোটি পরিবারকে টিসিবির আওতায় কম মুল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে একটি দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ সামাজিক স্থিরতা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের পাশাপাশি জনগণের দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু দেশের জনগণ হিসেবে আমরা সে দায়বদ্ধতা কতটুকু পালন করছি-সে বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

শাহজাহানপুরের খুনের ঘটনায় যেমন আকাশ নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে ডাক্তার বুলবুলের হত্যাকারীকেও খুব দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেফতারর করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক-এটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তাদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে এসে বিচারকার্য সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে যাবে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উত্থান-পতন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কিংবা বাজারে কিছুটা অস্থিরতা-এটি খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু এ সাধারণ ঘটনাগুলোকে অসাধারণ বানিয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায় তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যেই শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দেখতে পেয়েছি। একটি দেশ কীভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। সেই দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীতে অত্যন্ত শক্তিশালী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছে। সে অবস্থায় দাঁড়িয়ে জনগণের উচিত সহিষ্ণু আচরণ করা। আমাদের সবাইকে যে বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত-তা হলো অসহিষ্ণুতা কখনোই কোনো ভাল ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে না। অসহিষ্ণু আচরণ সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায় এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়লে সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

লেখক- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।

মন্তব্য করুন


Link copied