আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ৩০ জুন ২০২২ ● ১৬ আষাঢ় ১৪২৯
আর্কাইভ   বৃহস্পতিবার ● ৩০ জুন ২০২২
PMBA
PMBA

ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য

সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, দুপুর ০১:০৯

 শেখ মাজেদুল হক

জন্ম লগ্ন থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে মধ্যে সূচনা হয় আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ড এবং দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের।

ভাষা আন্দোলনের সূচনাটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। পাকিস্তান জনপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি বাস্তব দাবি তোলেন, প্রস্তাবটি রাষ্ট্রভাষার নয়, গণপরিষদে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তি- যাতে গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরা স্বচ্ছন্দভাবে নিজ মাতৃভাষা তথা বাংলায় বক্তৃতা করতে পারেন।

এই সাদামাঠা দাবিটুকুই সহ্য হয়নি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীসহ অন্য উর্দুভাষী ও অবাঙালি সদস্যদের। এমনকি কোনো কোনো বাঙালি মুসলিম লীগ নেতার। প্রধানমন্ত্রী তীব্র ভাষায় এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এমনকি প্রসঙ্গক্রমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরোধিতার বিষয়টি উল্লেখ করতে ভোলেন না।

আলোচনা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে গিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়ায় এর বিরোধিতায় এবং ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের বিরুদ্ধে সমালোচনায় এবং এমন আলোচনায় যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্যতা উর্দুরই রয়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারির ব্যবহারিক বাংলার প্রস্তাব (১৯৪৮) এভাবে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বাঙালি ছাত্র-যুবাদের আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করে। শুরু হয় ১১ মার্চের (১৯৪৮) রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। মূলত পিকেটিং।

এর পর অনেক ঘটনা। পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সমঝোতা প্রস্তাব, ছাত্রবন্দিদের মুক্তি ইত্যাদি। কারণ একটাই। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফর (মার্চ ১৯৪৮) সমস্যামুক্ত ও নিরুপদ্রব করা। লক্ষ্য করার মতো ঘটনা- এ ব্যাপারে তমদ্দুন মজলিস প্রভাবিত সংগ্রাম পরিষদ ও অধ্যাপক আবুল কাসেম প্রমুখের আপসবাদী ভূমিকা আন্দোলন স্থগিত করার ক্ষেত্রে।

সদ্যঃস্বাধীন পাকিস্তানে উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে শুরু হয় প্রতিবাদ। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে। এ লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের মার্চে শুরু হওয়া আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালে। ছাত্রদের প্রতিবাদ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়। পুনরায় ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট এবং ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কলা ভবনের (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) আমগাছতলায় সমবেত হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বেপরোয়া কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং তাঁদের লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে পুুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের দিকে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থান থেকে গুলি চালায়। গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত, শিল্প বিভাগের পিয়ন আবদুস সালাম, মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দীন ও গফরগাঁওয়ের অধিবাসী আব্দুল জব্বার শহীদ হন।  

ভাষার দাবির অপরাধে বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশ, বিশেষত ঢাকা নগরী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে এক গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পর ঢাকায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ শোকযাত্রা বের হয়। শোকযাত্রাটি হাইকোর্ট ও কার্জন হলের মাঝখানে রাস্তায় এলে পুলিশ আবার গুলি চালায়। শহীদ হন হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান ও রিকশাচালক আউয়াল। দুই দিনে পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর গুলি ও বেয়নেট চার্জে অন্তত আটজন শহীদ হন। পুলিশ অনেকের লাশ সরিয়ে ফেলে। এর মধ্যে দুজন ছিল বালক, যার একজন ছিল শিশুশ্রমিক অহিউল্লাহ।

বাংলা ভাষার দাবিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথম বাঙালি যেখানে শহীদ হয়েছিলেন, সেখানে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই একটি শহীদ মিনার বানিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশের এই প্রথম শহীদ মিনারটি ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক তীর্থক্ষেত্র এবং সংগ্রামী প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংবিধানে বাংলাকে উর্দুর সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের স্মরণে ‘শহীদ দিবস’ রূপে পালিত হয়ে আসছে। কালো পতাকা, প্রভাতফেরি, খালি পায়ে শোভাযাত্রা, শহীদদের কবর ও নিশ্চিহ্ন শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়। যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মত্যাগের ও জাগরণের গৌরবময় দিন হিসেবে পালন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এই দিনটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভাষাশহীদদের রক্তস্মৃতিবিজড়িত স্থানে পরে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন দেশের বাঙালি অধ্যুষিত স্থানে গড়ে উঠেছে অগণিত শহীদ মিনার। করুণ সুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান গেয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের মানুষ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজন করে অমর একুশে বইমেলা।

বাঙালির এই গৌরবময় দিনকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে বসবাসরত রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম। তাঁরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সালে। জাতিসংঘ মহাসচিবের অফিস থেকে আবেদনকারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, বিষয়টির জন্য নিউ ইয়র্কে নয়, যোগাযোগ করতে হবে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর সঙ্গে। আর বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, ইউনেসকোর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে সভায় এটি তুলে ধরা হবে। এরপর কানাডা থেকে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠান।এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সংস্থা ইউনেস্কোর অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাই ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্টগুলোয় (বর্তমানে এই সংখ্যা ১৯৩) ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ইউনেস্কোর এ সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট অর্জন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করল এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল অধ্যায়টি বিশ্ব ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হলো।

২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে মাতৃভাষার দাবিতে সংগ্রামরত পূর্ব বাংলার দামাল ছেলেদের কথা উচ্চারিত হচ্ছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে সেসব তরুণের আত্মদানের কথা। পরম শ্রদ্ধা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে রফিক, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, শফিউর রহমান, ওয়ালিউল্লাহসহ নাম না জানা আরো অনেক শহীদকে।তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ঢাকার শহীদ মিনার এখন শুধু ঢাকার নয়, এই শহীদ মিনার সারা বিশ্বের। হয়ে উঠেছে নতুন নতুন সংগ্রামের পবিত্র স্মারক, বিজয়ের প্রতীক, অনুপ্রেরণার উৎস।একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাঙালির নয়, সারা বিশ্বের, সারা বিশ্বের মাতৃভাষাপ্রিয় সব মানুষের। ৫ই আগষ্ট, ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক এখন' থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হবে' প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ ঘটনা গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয় হয়ে থাকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য। এখানেই গুরুত্ব ও তাৎপর্য মহান একুশে ফেব্রুয়ারির।

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। E-mail: [email protected] 

 

 

মন্তব্য করুন


Link copied